ব্রেকিং:
প্রভাবশালীর দাপটে বালু ফেলে নদী দখল টানা দ্বিতীয় বারের মত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক জান্নাতুল রেলস্টেশনের মর্যাদা রক্ষায় ১১ দাবি ইউএনও উদ্যোগে ঘর পেল অসহায় পরিবার চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, রক্ত দিলেন সাধারণ মানুষ পৌরসভা নির্বাচনে জয়ীদের শপথ অনুষ্ঠিত ট্রেন দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা ট্রেন দুর্ঘটনার জেলা প্রশাসনের তদন্ত শুরু ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত সবার পরিচয় মিলেছে বন্দুকযুদ্ধে ডাকাত সরদার নিহত ভোরে মসজিদের মাইকে আসে সহযোগিতার ঘোষণা একনজরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্রেন দুর্ঘটনা বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে আনার কার্যকরী উপায় আয়কর মেলা শুরু বৃহস্পতিবার জামালপুরে ফেরীতে পার হয় ট্রেন, অবাক বিশ্ব নিমিষেই দূর করুন ছারপোকা! কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসূল (আ.)-দের বিশেষ বিশেষ দোয়া ইমার্জিং এশিয়া কাপের ট্রফি উন্মোচন এখনো বেঁচে আছেন হুমায়ূন আহমেদ ‘প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করলে ক্ষমা করবে না জনগণ’

বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৯ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

৬৭৯

মণিপুরী জাতির বৈচিত্র্যতা

প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮  

ভারত ও বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নাম। এদের আদি নিবাস ভারতের মণিপুর রাজ্যে। মণিপুরীদের নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। ভারতের মণিপুর রাজ্যে ও বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের শিকার হয়ে এবং যুদ্ধজনিত কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের অধিবাসীরা দেশত্যাগ করে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। পার্শ্ববর্তী আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলায়, ত্রিপুরা রাজ্যে, পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে এবং বাংলাদেশে ব্যাপক সংখ্যক মণিপুরী অভিবাসন ঘটে। বার্মা-মণিপুর যুদ্ধের সময় (১৮১৯-১৮২৫) তৎকালীন মণিপুরের রাজা চৌরজিৎ সিংহ, তার দুই ভাই মারজিৎ সিংহ ও গম্ভীর সিংহসহ সিলেটে আশ্রয়গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে আশ্রয়প্রার্থীদের অনেকেই স্বদেশে ফিরে যায়, কিন্তু বহু মণিপুরী তাদের নতুন স্থানে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়। বাংলাদেশে আসা মণিপুরীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর, ঢাকারমণিপুরী পাড়া এবং প্রধানত বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ে তোলে বর্তমানে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনমিগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় মণিপুরী জনগোষ্ঠীর লোক বাস করে।

 

মণিপুরী নারীরা

মণিপুরী নারীরা

ভাষা

ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশের মণিপুরীরা দুটি শাখায় বিভক্ত- মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ। দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত সিলেট অঞ্চলে মণিপুরীদের বাস। বৃহত্তর সিলেটের চারটি জেলা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার প্রায় এগারোটি উপজেলায় সুদীর্ঘকাল যাবৎ মণিপুরীরা নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে লালন করে দৈনন্দিন জীবনাচারে স্বীয় ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পালন করে আসছেন। মণিপুরী নৃত্য ও সংস্কৃতি তাদের গর্ব যা দেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধশালী করে তুলেছে। এক ধর্ম ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হয়েও মণিপুরীদের মধ্যে দুটো ভাষা বিদ্যমান। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা ইন্দো-আর্য শ্রেণীভুক্ত আর মণিপুরী মৈতৈ ভাষা তিব্বত-বর্মা শ্রেণীভুক্ত। দুটি আলাদা উৎস থেকে উৎপন্ন হলেও মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ ভাষা নিকটাত্মীয় এজন্য যে, পূর্বোক্ত ভাষা পরোক্ত ভাষা থেকে প্রচুর পরিমাণে শব্দসম্ভার নিগমবন্ধন বা আত্তীকরণ করেছে।এডওয়ার্ড টিউলিট ডেলটন তার ডেসক্রিপটিভ এথনোলজি অব বেঙ্গল গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘The Valley (Manipur) was at first occupied by several tribes, the principal of which were named khumal, Angoms, Moirang and methei.’ মৈতৈরা পূর্বদিক থেকে এবং বিষ্ণুপ্রিয়ারা পশ্চিম দিক থেকে মণিপুরে প্রবেশ করে প্রাচীনকালে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করে। কাছাড়ের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ উল্লেখ করেন, ‘প্রাচীনকালে মণিপুর উপত্যকায় একটি বিস্তীর্ণ জলাভূমি ছিল। পার্বত্য নদীসমূহের আনিত পলি মাটি দ্বারা ক্রমে জলাভূমি ভরাট হতে থাকে। কালক্রমে এ ভূ-ভাগে পাঁচটি দ্বীপের উৎপত্তি হয়। অতি প্রাচীনকালে কামরূপ, কাছাড় ও ত্রিপুরা হতে মণিপুর ও ব্রহ্মদেশ পর্যন্ত একটি বিশাল আর্যোপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। পূর্বাঞ্চলের প্রায় সর্বত্র যেখানে যেখানে সমুদ্র মানুষের বসতির জন্য একটু স্থান দিয়ে সরে গিয়েছে, তার সর্বত্রই আর্যগণ কর্তৃক অধ্যুষিত হয়েছিল।’মহাভারত মহাকাব্য আদিপর্ব ২১৪ অধ্যায়ে আর্যশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন কলিঙ্গতীর্থ ও তত্রত্য পুণ্যতীর্থ অতিক্রম করে সুরম্য হর্ম্ম্যাবলী দর্শন করে তাপসগণ পরিশোভিত মহেন্দ্র পর্বত অতিক্রম করে সাগর উপকূলমার্গে মণিপুর গমনের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তথায় মণিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে দর্শন ও বিবাহ এবং পুত্র বভ্রুবাহনের কাহিনি ও বর্ণিত রয়েছে। বভ্রুবাহন দীর্ঘদিন মণিপুর রাজত্ব করেছিলেন।

 

‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনাট্যের দৃশ্য

‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনাট্যের দৃশ্য

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রাঙ্গদা গীতিনাট্যে অর্জুন-চিত্রাঙ্গদার মণিপুর কাহিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্তমান মণিপুর মহাভারতোক্ত মণিপুর কি না- এ প্রশ্নে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে নানা মত পরিলক্ষিত হয়। বৃহৎবঙ্গ গ্রন্থকার দীনেশচন্দ্র সেন বর্তমান মণিপুরকে মহাভারতের মণিপুর বলে মত দেন। কালক্রমে পনেরশ’ খ্রিষ্টাব্দের পর মণিপুরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো একত্রীকরণ শুরু হয়। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতি মানুষের নয়টি শাখায় বিভিন্ন কালে ভারতে এসেছে; এবং তাদের মিশ্রণে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের অধিবাসীদের উদ্ভব ঘটেছে। এই মিশ্রণ ক্রিয়া কোথাও গভীরভাবে হয়েছে, কোথাও উপর উপর হয়েছে। আর্যভাষি জনগণ রক্তে ও সভ্যতায়, ধর্মে ও সংস্কৃতিতে যারা পাশাপাশি বাস করতে থাকে তাদের সঙ্গে মিশ্রিত হতে শুরু করে। এই মিশ্রীকরণ বা জাতীয় সমীকরণ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে ও খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রকের পূর্বাহ্নেই এই সমীকরণ নিজ বিশিষ্ট পথে চালিত হয়। প্রাচীন ভারতীয় জাতি তখন কিছু পরিমাণে মোঙ্গোলের ও মিশ্রণের ফলে প্রথম নিজ বিশিষ্ট রূপ গ্রহণ করে। আর্যভাষী চিন্তানেতাদের মনীষা, তাঁদের উদারতা ও দূরদৃষ্টি, এই সাংস্কৃতিক মিলনকে একটি পরিপূর্ণ নবীন সংস্কৃতি গঠনের পথে চালিত করতে সমর্থ হয়।’ (সাংস্কৃতিকী ১ম খণ্ড) বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ ভাষাভাষি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি সহাবস্থান, পরবর্তীতে একই ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার উত্থান তাদের মধ্যে এক অবিমিশ্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কীর্তন, রাসলীলা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি নৃত্য তাল মান লয় একই ধারায় চালিত হয়। তাই মণিপুরী সংস্কৃতি বিভিন্ন স্বতন্ত্র জাতির নিজ নিজ বিশিষ্ট সংস্কৃতির সমন্বয়ের ফল। উভয় ভাষাই মণিপুরের মাটিতে সৃষ্টি হয়। ‘দ্য ব্যাকগ্রাউন্ড অব অ্যাসেমস কালচার’ গ্রন্থের লেখক বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর মণিপুরী জাতির ইতিবৃত্ত নিবন্ধে বলেন, ‘কত যুগের কত মানুষের ধারা কত দিক হইতে আসিয়া মিশিয়া এক দেহে লীন হইয়া বর্তমান মণিপুরী জাতির সৃষ্টি করিয়াছে। তথাপি রহিয়া গিয়াছে দুইটি স্বতন্ত্র ধারা- মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। আদিতম অধিবাসী ও কিরাত গোষ্ঠীর স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহের কনিকা ও অবহেলিত নয়।’বাংলাদেশে (পাকিস্তান আমলে) প্রথম ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা আদিবাসী বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেন আবদুস সাত্তার মহোদয়। ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রকাশিত ‘আরণ্য জনপদে’ গ্রন্থে তিনি ১৯টি জাতিসত্তার বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। মণিপুরী জাতিসত্তা বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মণিপুরীরা দুই শাখায় বিভক্ত যথা বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ। এরা প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ একটা বীরের জাতি। বহু যুগের রক্তস্রোতের আবরণে তাদের স্বরূপ আচ্ছন্ন হয়ে আছে।’ (পৃ-২৯৭)। তিনি তাঁর গ্রন্থে সংগৃহীত ৬০টি শব্দমালাও সংযোজন করেছেন। ইতিহাসের পথ পরিক্রমার বিভিন্ন সময়ে মণিপুরীরা (মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া) মণিপুরের বাহিরে কাছাড়, সিলেট, ত্রিপুরা, মিয়ানমারে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য মণিপুর-বর্মা যুদ্ধ, রাজ পরিবারসমূহের কলহ, ব্রিটিশ কর্তৃক এ রাজ্য দখল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মণিপুরের বাহিরে ছড়িয়ে পড়া এসব মৈতৈ মণিপুরী ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীগণ তাদের ভাষার পূর্ণরূপ নিয়ে বাহিরে এসে একসঙ্গে একই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সিলেট অঞ্চলের সমগ্র মণিপুরী সমাজ ও একই সময়ে একই ঘটনা প্রবাহে, নিজস্ব ভাষার পূর্ণরূপ নিয়ে বসতি স্থাপনের পর তাদের পারিবারিক পর্যায়ে ও সমাজে স্ব স্ব ভাষা ব্যবহার করে আসছেন।

মণিপুরী আহার

মণিপুরী আহার

মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা বাংলাদেশে বসবাসকারী মণিপুরীদের বৃহত্তম সম্প্রদায়ের ভাষা বলা চলে। ড. জি এ গ্রিয়ার্সন এ ভাষাকে ইন্দো-আরিয়ান ফ্যামিলি এর ইস্টার্ণ বা ভারতীয় আর্য শাখার পূর্বাঞ্চল ভাষার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ভারতীয় আর্য প্রশাখা থেকে ক্রমশ বিবর্তন ও পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাই মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা অহমিয়া, উড়িয়া ও বাংলা প্রমুখ মাগধীজাত ভাষাগুলোর সহোদরা স্থানীয়া। আবার চাকমা ভাষার সঙ্গেও নৈকট্য রয়েছে। কোনো ভাষার যথার্থ পরিচয় ওই ভাষার মৌখিক বা কথ্যরূপের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। সুতরাং মুখের ভাষার প্রয়োজনীয় নিদর্শনসমূহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তুলনার মধ্য দিয়ে একটি ভাষার যথার্থ বিশ্লেষণ বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটন সম্ভব। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন লোকগীতি হলো ‘বরণ ডাহানির এলা’ বা ‘বৃষ্টি আবাহনী সংগীত’। ‘খুমেলর মাটি হুকেইলো বরণ দিয়াছে দৌরাজা।’অর্থাৎ খুমলের (প্রাচীন বিষ্ণুপ্রিয়াদের আবাসভূমি) মাটি অনাবৃষ্টিতে ফেটে চৌচির হয়ে গেল। বৃষ্টি দাও, হে বৃষ্টির দেবতা (ইন্দ্র)। খরার সময় রাত্রিকালে বৃদ্ধ মহিলারা মাঠে গানটি গেয়ে অভিনয় করে বৃষ্টি আবাহন করলে ইন্দ্র দেবতা তা শ্রবণ করেন এবং বৃষ্টিপাত হয় বলে বিশ্বাস রয়েছে। এখনও অনাবৃষ্টির সময় গ্রামের বৃদ্ধ মহিলারা গানটি গেয়ে থাকেন। আর একটি প্রাচীন সংগীত হলো ‘মাদৈ-সরালেল এলা বা মাদৈ-সরালেল’। রাজকন্যা মাদৈ এবং রাজা সরালেল সম্পর্কিত এ গানটি অনুমান ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের রচনা। মাদৈ সরালেল গানটি নিম্নরূপ- ‘মাদৈ গিদেই সালুইলী, বকচা বাধিয়া সালকরলা কতিয়ৌ দূরেই ইলীতা, টেঙারা সিঞ্চাঙ লালুইলী বাবারো মাটিয়ো না দেখলো কতিয়ৌ দূরেই ইলীতা।’মাদৈ, এক রাজকন্যাকে সরালেল (দেবতাদের রাজা) এর কাছে বিবাহ দেওয়া হয়। সে সরালেলের প্রাসাদের দিকে রওয়ানা দিল। কন্যার সঙ্গে যাবতীয় যৌতুকাদি জোগাড় করে বেঁধে দেওয়া হলো। মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অভিভাবক মাদৈকে সজ্জিত করে পাঠান। বাধা-বিঘ্ন কাটিয়ে জঙ্গলাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে সে চলে গেল। যেখান থেকে ফিরে ফিরে তাকিয়ে দেখছে শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম-গঞ্জ আর মা-বাবার আদর-সোহাগে জড়ানো বাবার ভিটেমাটি বাড়িটিকে কিন্তু চলার দূরত্ব গতি সেই শৈশব স্মৃতি বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। দেখতে পেলো না না বাবার ঘরটি। সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।

সংস্কৃতি

 

মণিপুরি সংস্কৃতি

মণিপুরি সংস্কৃতি

মণিপুরী ছেলেরা বাদজন্ত্র শিক্ষায় অনুরাগী।মণিপুরীদের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী। মণিপুরী সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম দিক হলো মণিপুরী নৃত্য যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মণিপুরীদের মধ্যে ঋতুভিত্তিক আচার অনুষ্ঠান বেশি।বছরের শুরুতে হয় মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের বিষু এবং মৈতৈদের চৈরাউবা উৎসব। আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা ও কাঙ উৎসবের সময় প্রতিরাত্রে মণিপুরী উপাসনালয় ও মন্ডপগুলোতে বৈষ্ণব কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ নাচ ও গানের তালে পরিবেশন করা হয়। কার্ত্তিক মাসে মাসব্যাপী চলে ধর্মীয় নানান গ্রন্থের পঠন-শ্রবন। এরপর আসে মণিপুরীদের বৃহত্তম উৎসব রাসপূর্ণিমা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরের রাজা মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র প্রবর্তিত শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলানুকরন বা রাসপুর্ণিমা নামের মণিপুরীদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রায় দেড়শত বছর ধরে (আনুমানিক ১৮৪৩ খ্রী: থেকে) পালিত হয়ে আসছে। কার্ত্তিকের পুর্ণিমা তিথিতে দুরদুরান্তের লাখো ভক্ত-দর্শক সিলেটের মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুর জোড়ামন্ডবের এই বিশাল ও বর্ণাঢ্য উৎসবের আকর্ষনে ছুটে আসেন। বসন্তে দোলপূর্ণিমায় মণিপুরীরা আবির উৎসবে মেতে উঠে। এসময় পালাকীর্ত্তনের জনপ্রিয় ধারা "হোলি" পরিবেশনের মাধ্যমে মণিপুরী তরুণ তরুণীরা ঘরে ঘরে ভিক্ষা সংগ্রহ করে। এছাড়া খরার সময় বৃষ্টি কামনা করে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়ারা তাদের ঐতিহ্যবাহী বৃষ্টি ডাকার গান পরিবেশন করে থাকে।

বিয়ে

মণিপুরী বিয়ে

মণিপুরী বিয়ে

স্বতন্ত্র ধারায় জীবন যাপনে তাদের বৈশিষ্ট্য বেশ লক্ষনীয়। নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ ও চর্চা তার মধ্যে অন্যতম। নিজেদের তৈরী পোশাক, খাবার, নৃত্য শৈলী ও স্বতন্ত্র পারিবারিক ধারা তাদেরকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছে।মণিপুরীরা ক্ষত্রিয় এবং সামবেদের অনুসারী। অমণিপুরী ক্ষত্রিয়ের বিবাহ ও শ্রাদ্ধে যেসব মন্ত্র উচ্চারিত হয়, মণিপুরীদের বিবাহ ও শ্রাদ্ধে সেসব উচ্চারিত হয়। পার্থক্য শুধু মণিপুরীদের বিবাহ শ্রাদ্ধে সংকীর্তন অঙ্গীভূত করা হয়েছে, বিবাহে সংকীর্তনসংযোজন বিতর্ক হলেও। মণিপুরী বিয়েতে কেউ চেয়ারে বসেনা, আসন পেতে মাটিতে বসে। বিয়েতে সবার জন্য আলাদা বসার জায়গা থাকে। বিয়েতে কুঞ্জ উভয় সম্প্রদায়েরই থাকতে হবে। দিনব্যাপী কীর্তন হয় সেখানে। কীর্তন এর সময় নাচ হয় সেই তালে নাচে মেয়েরা। মেয়েদের পায়ের তাল দেখে নেন অভিভাবকরা। আজও মণিপুরী বিয়েতে শ্রীকৃষ্ণের ভজন বাধ্যতামূলক। এর অন্যথা হলে বা অন্য সম্প্রদায়ের কাউকে বিয়ে করলে সমাজচ্যুত হতে হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোর মণিপুরীদের অনুশাসন।নভেম্বর মাসে এই উৎসবের মুল আকর্ষণ মেয়েরা নিজেদের বাপের বাড়িতে আসেন স্বপরিবারে।

নৃত্য

মণিপুরী নৃত্য

মণিপুরী নৃত্য

নৃত্যশেলীর একটি প্রাচীন ধারা। মণিপুরের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এই নৃত্যকে মণিপুরের সুপ্রাচীন নৃত্যধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি মূলত একটি নৃত্য-উৎসব হিসেবে মণিপুরে পালিত হয়।মণিপুরি লাই শব্দের অর্থ হলো− দেবতা, হারাউবা' শব্দের অর্থ হলো− আনন্দ-নৃত্য। মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্ম প্রাধান্যলাভের আগে, শৈবমতের ব্যাপক প্রভাব ছিল। দেবতা শিবের প্রতীক হিসেবে 'লাই' ছিল শিবলিঙ্গের প্রতীক। ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে মণিপুর শৈব এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহাবস্থানে একটি শান্তির জনপদে পরিণত হয়েছিল। ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পামহৈবা মণিপুরের রাজত্ব লাভের পর বৈষ্ণবদের আধিপত্য প্রবলতর হয়ে মণিপুরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কারণ, রামানন্দীর ভাবদর্শের বিশ্বাসী বৈষ্ণব সাধক শান্তি দাস অধিকারীর অনুপ্রেরণায় রাজা পামহৈবা বৈষ্ণব মত গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার মতকে একরকম জোর করেই মণিপুরে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে এই অঞ্চলে শৈবমতাদর্শের লোকের একরকম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই সময় রাজা পামহৈবা অন্যান্য মতের গ্রন্থাদি ও নিদর্শন ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে মণিপুরের ইতিহাসও ধ্বংস হয়ে যায়। মণিপুরের বৈষ্ণবরাও দেবতা হিসাবে শিবকে শ্রদ্ধা এবং পূজা করতো। ফলে প্রবল বৈষ্ণব আধিপত্যের যুগেও শিব-পার্বতীর লীলা ভিত্তিক গীত ও নৃত্য বিলুপ্ত হয়ে যায় নি। ফলে 'লাইহারাউবা'- নৃত্য মর্যাদা হারাতে হারাতে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। রাজা চন্দ্রকীর্তি সিংহাসনে ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বাসার পর তিনি এই নাচকে আবার প্রচলন করেন।

 

মণিপুরী নৃত্য

মণিপুরী নৃত্য

বর্তমানে লাইহারাউবা নৃত্য দুই ভাবধারায় পরিবেশিত হয়। এই ভাবধারা দুটি হলো মৈরাঙ লাইহারাউবা ও উমঙ লাইহারাউবা। এই দুটি ধারাতেই পরিবশিত হয় নানা ধরনের কাহিনি নির্ভর নৃত্যগীত। এর ভিতরে খাম্বাথৈবী, নঙ্‌পক্‌নিঙ্‌থুপানথেবী, থনজিঙ লাইরেম্বী উল্লেখযোগ্য। এই নাচে তাণ্ডব ও লাস্য উভয় ধারাই ব্যবহৃত হয়। এই নৃত্য শৈব নৃত্যধারার হলেও, এতে পরবর্তী সময়ে রাসনৃত্যের ভঙ্গীপারেঙ-এর প্রভাব পড়ে এই নৃত্যধারার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, মণিপুরের সনাতন ধর্মে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব। মণিপুরের লোক পুরাণ মতে- নয়জন লাইবুঙথ (দেবতা) এবং সাতজন লাইনুরা (দেবী) পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। আদিতে পৃথিবী জলমগ্ন ছিল, আর সেই জলের উপর সাতজন লাইনুরা নৃত্য করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে নয়জন লাইবুঙথ স্বর্গ থেকে লাইনুরাদের লক্ষ্য করে মাটি নিক্ষেপ করতে থাকেন। নৃত্যরতা সাতজন লাইনুরা সেই ছুঁড়ে দেয়া মাটির উপর নেচে নেচে পৃথিবীর স্থলভাগ তৈরি করেন। এই ভাবনা থেকে লাইহারাউবা নৃত্যের সূচনা হয় 'লাইএকাউবা'। এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন কিছু দেবদাস এবং দেবদাসী। উল্লেখ্য, মণিপুরে দেবতাদের সেবায় যে পুরুষরা সারাজীবন নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, তাদের বলা হয় মৈবা (দেবদাস)। একইভাবে যে নারীরা দেবতাদের সেবায় সারাজীবন নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, তাদের বলা হয় মৈবী (দেবদাসী)।

পোশাক ও হস্তশিল্প

মণিপুরীদের পোশাকের বাহার

মণিপুরীদের পোশাকের বাহার

বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে বাস করে এ দেশের অন্যতম নৃ-গোষ্ঠী মণিপুরী সম্প্রদায়। আঠারো শ’ শতক থেকে এই এলাকায় মণিপুরীদের বাস। এ দেশে প্রায় দেড় লাখ মণিপুরী বসবাস করে। মণিপুরী নারীদের সুখ্যাতি রয়েছে হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ের জন্য। শ্রীমঙ্গল ও বিশেষ করে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের প্রায় ৬০টি গ্রাম বিখ্যাত মণিপুরী তাঁতশিল্পের জন্য। বাংলাদেশের প্রাচীন হস্তশিল্পগুলোর মধ্যে মনিপুরী হস্তশিল্প সু-প্রসিদ্ধ। মনিপুরী হস্তশিল্প অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। তাঁত শিল্পের সঙ্গে মনিপুরীদের রয়েছে যুগযুগান্তরের সম্পর্ক মনিপুরী সমাজে মেয়েদের তাঁত শিল্পের অভিজ্ঞতাকে বিয়ের ক্ষেত্রে পূর্বযোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। এমনকি মেয়েরা যখন জন্ম নেয়, একটু বড় হলেই মায়েরা মেয়েদেরকে তাতে বুনন কাজ শেখায় এই উদ্দেশ্যে যে এই কাজ শিখলে তাদের বিয়ের সময় এটা যৌতুকের একটা অংশ হিসাবে কাজ করবে। মনিপুরীদের বস্ত্র তৈরির তাঁতকল বা মেশিন প্রধানত তিন প্রকার যেমন, কোমরে বাঁধা তাঁত, হ্যান্ডলুম তাঁত ও থোয়াং। এই তাঁতগুলো দিয়ে সাধারণত টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, লেডিস চাদর, শাড়ি, তোয়ালে, মাফলার, গামছা, মশারী, ইত্যাদি ছোট কাপড় তৈরি হয়। প্রধানত নিজেদের তৈরি পোশাক দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই মনিপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে তাঁত শিল্পে নির্মিত সামগ্রী বাঙালি সমাজে নন্দিত ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নকশা করা ১২ হাত মনিপুরী শাড়ি, নকশি ওড়না, মনোহারী ডিজাইনের শীতের চাদর বাঙালি মহিলাদের সৌখিন পরিধেয়।

তাঁতে বুনন পদ্ধতি

তাঁতের শাড়ী বুনন

তাঁতের শাড়ী বুনন

চাকমা তাতিদের মতো মণিপুরী তাঁতিদেরও তাঁতে কাপড় বুননের জন্য নিজস্ব তাঁত আছে। তাঁতে বুনন পদ্ধতিটা মোটামুটি চাকমাদের বুনন পদ্ধতির মতই। তাঁতে ব্যবহৃত উপাদান গুলোর নাম ও কাপড়ে তোলা নকসার ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সূতা তাঁতের সঙ্গে বাঁধা হয়ে গেলে তাঁতি বুনন করতে বসে পড়েন তার পিঠে তাঁতের সাথে সাটানো চামড়ার ব্যকস্ট্রিপটা পিঠে আটকে নেন। বুনন করার জন্য বুননকারী তাঁতের দৈর্ঘ্য বরাবর আটকানো সুতাগুলোকে উপর নিচে চালাতে থাকে নাইচ বয়ার নেসির মাধ্যমে; এগুলো এক ধরণের এবং শেড নামের এক ধরণের স্পেস তৈরি করতে সাহায্য করে।পরে শেডের মধ্যে উল্লম্ব বরাবর বেং বা টেয়াম স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে বুননকারী শেডের ভেতর দিয়ে একটা সাঁটল ঢুকিয়ে দেয়। এরপর তাঁতি বেং বা টেয়াম চ্যাপ্টা প্রান্ত ব্যবহার করে বুনন করা কাপড়ের বিপরীত দিকে প্রস্থ বরাবর স্তাহপ্ন করা সূতাগুলোকে ধাক্কা বা বাড়ি দিতে থাকে। এসময় বেং বা টেয়াম বের করে নেয়া হয় এবং এর পরিবর্তে উটোং ব্যবহার করা হয় সুতাগুলোকে বিপরীত দিকে নেয়ার জন্য। রে বেং বা টেয়ামকে আবার শেডের মধ্যে উলম্ব বরাবর প্রতিস্থাপন করা হয় এবং বাম থেকে ডান দিকে একটা সাঁটল ঢুকানো হয়। জনপ্রিয় মনিপুরী ডিজাইন হচ্ছে ঝাউ গাছ, সেফালি ফুল, এবং মন্দিরের নকসা; এই নকসা মইরাং ফি নামে পরিচিত। রাজকুমারি মইরাং থইবি নাম অনুসারে এই নামকরণ হয়েছে। তাঁতে কাপড়ে নকশা তোলার জন্য তাঁতি এক ধরণের সুচালো যন্ত্র ব্যবহার করে জামদানীর ক্ষেত্রে।কী ধরণের কাপড় বুনা হবেটা অনেক সময় স্থানীয় আবহাওয়ার উপরও নির্ভর করে।

 

তাঁতের শাড়ি বুনন

তাঁতের শাড়ি বুনন

যেমন তিলকপুরের তাঁতিরা শীতকালে কাপড় বুনার জন্য উল ও পলিয়েস্টারের সূতা ব্যবহার করে অন্যদিকা গ্রীষ্মকালে তুলার সূতা ব্যবহার করে ফানেক,গামছা ও ফিদু তৈরির জন্য। সাধারণত তারা তুলা ত্রিপুরা সম্প্রদায় থেকে সংগ্রহ করতো। তবে বর্তমানে বাজার থেকে সুতি সূতা ক্রয় করে। মণিপুরীদের তৈরি ফানেক খুব আকর্ষণীয় উজ্জলও বিপরীতমুখী রং ব্যবহার করা হয় শরীরের অংশে আর বর্ডারের । প্রতিদিন পড়ার কাপড়ে তারা সমতল পাড়ের কাপড় তৈরি করে । কিন্তু বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি কাপড়ে “টেম্পল মোটিফ” বুনন করে। তবে অনেক মনিপুরী তাঁতিই জানান যে ব্যাক স্ট্রিপ কাজ অনেক কষ্টসাধ্য এবং এতে বেশি সময় ব্যয় হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাড়িতে নকসা তলার সময় মনিপুরীরা কম সূতা ব্যবহার করে গাথুনি বেশ পাতলা রাখে। বাঙালী মহিলারা একে “মশার জাল” বলে। অতীতে মনিপুরীরা আরও অনেক ধরণের দিজাইনে কাপড় তৈরি করতো যেমন কানাপ, খাম্মেন, চাতপা, সাতকাপা ফি অবশ্য এগুলো তেমন এখন দেখা যায় না। এগুলো নকাশা তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে তাঁতিরা । বর্তমানে মনিপুরীরা নিজেদের ব্যবহার ও বাজার বিক্রয়ের জন্য তৈরি কাপড়ে কিছুটা সহজ প্রকৃতির নকশা তোলে ।

ধর্ম

মণিপুরী নৃত্য

মণিপুরী নৃত্য

ধর্মীয় বিচারে সকল মণিপুরী বর্তমানে চৈতন্য ধারার সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে সনাতন ধর্মগ্রহণের পূর্বে মণিপুরীরা অপক্পা ধর্মচর্চা করত। পরবর্তীকালে যদিও সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য মণিপুরীদের মন জয় করে নেয়, কিন্তু তারা তাদের পূর্বের বিশ্বাস একেবারে বিজর্সন দেয়নি। ফলে এই দুই বিশ্বাসের সংশ্লেষণে তৈরি হয়েছে একটি নব ধারার যার বহিরঙ্গে চৈতন্য ধারার প্রেমাবেগ সৌন্দর্য আর অন্তরঙ্গে রয়েছে পুরানো বিশ্বাস ও অনুভূতি। মণিপুরীরা একদিকে জাঁকজমকভাবে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি, যেমন রথযাত্রা, রাসপূর্ণিমা, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদি পালন করে, একইসঙ্গে তারা পূর্বের ধর্মীয় অনুষ্ঠান লাইহারাওবা, সাজিবু চেইরাওবা ইত্যাদিও পালন করে। তারা সানামাহি, পাকাংবা এবং লেইমারেন প্রভৃতি গৃহ দেবদেবীর পূজাও করে থাকে। এছাড়া অনেক মণিপুরী আছে যারা একইসঙ্গে আগের বিশ্বাস এবং ইসলাম ধর্ম পালন করে। এদের বলা হয় মেইতেই পানগন বা মণিপুরী মুসলমান। মণিপুরীদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জীবনের বিশেষ বিশেষ সন্ধিক্ষণে, যেমন জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে ইত্যাদিতে তারা নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রচলিত আচারাদি পালন করে থাকে।

আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
এই বিভাগের আরো খবর