ব্রেকিং:
ট্রেন দুর্ঘটনার সাহসী সেই পাঁচ যুবক সন্তানের মা হলেন সেই প্রতিবন্ধী ধর্ষিতা পাল্টে গেছে সরাইল বিশ্বরোড মোড়ের দৃশ্যপট! নিয়মিত হাঁটুন সুস্থ থাকুন! ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে কাতারে দোয়া মাহফিল হত্যার হুমকির প্রতিবাদে মানববন্ধন আমি জীবিত আছি, আমাকে হেল্প করুন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ট্রেন দুর্ঘটনার আসল কারণ ৪০ জনকে তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদ ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত শিশুর দায়িত্ব নিলেন উপমন্ত্রী ধান কাটার ধুম পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পাঁচ উপায় আর্থিক লেনদেন করা যাবে ফেসবুকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন ৪৮ জন নারীর মন জয় করুন এই কৌশলে তাওবার ৬ উপকারিতা সাকিব না থাকায় ভারতীয় সিকিউরিটি গার্ডের আফসোস ফোকফেস্টের পর্দা উঠছে আজ সমুদ্রের জলে ভেসে এলো ১০০০ কেজি কোকেন

শুক্রবার   ১৫ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ৩০ ১৪২৬   ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

১৪৮৯

ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের স্বরূপ

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম শব্দের সঙ্গে প্রায় সকলেই পরিচিত। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির যুগে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা নিজের আসন পুরো পৃথিবীজুড়ে পাকাপোক্ত করে নিয়েছে, যার আবেদন আগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া মুক্তবাজার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের ধারণা। এ সমাজ ব্যবস্থা মানব সভ্যতাকে শেষমেশ কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় তা গবেষণার বিষয়। তবে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেকেরই স্বল্প ধারণা রয়েছে। এই সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি কী এবং এর চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্পর্কে নাগরিকদের ধারণা থাকা খুব দরকার। তবে জেনে নিন-

দৈনন্দিন জীবনে কত কিছুই না আমরা ব্যবহার করি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রয়োজন হয় টুথপেস্ট কিংবা টুথব্রাশের, অফিস কিংবা স্কুল কলেজে যেতে প্রয়োজন হয় নানা ধরণের যানবাহন, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন হয় নানা রকম খাবার, পোশাক, বাড়ি, বিনোদনের জন্য দরকার হয় টেলিভিশন, যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন, কম্পিউটার। এসব কিছুকেই এক কথায় বলা হয় প্রোডাক্ট বা পণ্য। এ পণ্যগুলো উৎপাদনের জন্য রয়েছে কল-কারখানা, জায়গা-জমি, খনি ইত্যাদি, যেগুলোকে বলা হয় উৎপাদন যন্ত্র।

"পুঁজি" বলতে কী বোঝায়? কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যখন উৎপাদন যন্ত্রগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকে তখন সেসব উৎপাদন যন্ত্রকে বলা হয় পুঁজি। ধরুন আপনার এক লাখ টাকা সমমূল্যের জমি রয়েছে, যেখানে আপনি চাইলে ফসল উৎপাদন করতে পারেন, তখন সেই জমি বা উৎপাদন যন্ত্রকে বলা হবে আপনার পুঁজি, অর্থাৎ আপনার এক লাখ টাকার পুঁজি রয়েছে। সুতরাং সহজ ভাষায় বলতে গেলে যে সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদন যন্ত্রের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা বিদ্যমান, সেটিকে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। যাদের হাতে পুঁজি থাকে তাদের বলা হয় বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি। আর যাদের কোনো পুঁজি নেই, যারা দরিদ্র, তারা নিজেদের শরীর খাটিয়ে পরিশ্রম করে বুর্জোয়াদের জমি জমা, কল কারখানা, খনিতে। মাস শেষে সামান্য কিছু মাইনে নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এই শ্রমজীবী শ্রেণীকে বলা হয় সর্বহারা (proletariat)। শ্রম দেয়ার ক্ষমতা ছাড়া এদের অন্য কোন পুঁজি নেই। তাই এ শ্রেণীর মানুষ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সব সময়ই শোষিতের কাতারে থাকে। 

উৎপাদন যন্ত্রের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা আজ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র স্বীকৃত। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বেশি লাভ করে কীভাবে নিজেদের পুঁজি বাড়ানো যায় এ চিন্তায় বিভোর হয়ে আছেন পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা। এর ফলে কম দামে কীভাবে ভালো পণ্য উৎপাদন করে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, এ নিয়ে ছক কষা হচ্ছে বিস্তর। এতে বিক্রি বাড়বে, সেইসঙ্গে আসবে প্রচুর লাভ। আমার কাছে যে পণ্যটি ১০ টাকায় পাবেন, অন্য একজন যদি সেই একই ধরণের এবং একই গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য ১২ টাকায় বিক্রি করে, আপনি নিশ্চয় আমার থেকেই পণ্যটি কিনবেন! এভাবেই চলে প্রতিযোগিতা। পুঁজিপতিরা পণ্য উৎপাদনের খরচ কমানো ও গুণগত মান বাড়ানোর তাগিদে বিজ্ঞানীদের ডেকে আনেন, তারা নতুন নতুন কৌশল বা উপায় বাতলে দেন। ভাবছেন, দারুণ তো! এতে করে তো সেবার মান প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে! কিন্তু এটাই পুঁজিবাদের শেষ কথা নয়, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন সব রূঢ় বাস্তবতা যা পুরো মানব জাতিকেই দিন দিন কঠিন সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে, মানবিকতাকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ। চলুন তবে জেনে নেয়া যাক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে যেসব ভয়ানক কুফল লুকিয়ে আছে সেসব সম্পর্কে! 

প্রথমত, পুঁজিবাদের সুযোগ নিয়ে গুটি কয়েক পুঁজিপতি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, কিন্তু সমাজের বেশিরভাগ লোক দরিদ্র হয়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কারণ। উৎপাদনের প্রতিযোগিতার ফলে যাদের পুঁজি অল্প তারা বাজারে টিকতে পারে না। ফলে তারা অচিরেই পুঁজি হারিয়ে সর্বহারাদের দলে মিশে যায়, হয়ে পরে দরিদ্র। এভাবে প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার ফলস্বরূপ সমাজে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েই চলে, যাদের পুঁজি অনেক বেশি, তারাই টিকে থাকে সমাজের ধনিক শ্রেণী হয়ে।

দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ব্যবসা সংকটের পুনরাবর্তন। পুঁজিপতিদের একমাত্র লক্ষ্য হলো তাদের উৎপাদিত পণ্য থেকে "লাভ" করা। মুনাফা ছাড়া তারা অন্য কোনো কিছুর কথা চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু পুঁজিবাদের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ফলে সমাজে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে। এর ফলে পুঁজিপতিরা যেসব পণ্য উৎপাদন করে তা বিক্রি করতে পারে না। সহায় সম্পদহারা মানুষ একদিকে না খেতে পেয়ে মারা গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। খাদ্যের গুদামে খাদ্য নষ্ট হয়, বস্ত্রের গুদামে বস্ত্র পড়ে থাকে, অন্যদিকে অন্ন বস্ত্রের অভাবে দরিদ্র মানুষও মরতে থাকে। যতই মানবিক আবেদন তৈরি হোক, উপযুক্ত দাম না পেলে পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করে না। এমন পরিস্থিতিকে "ব্যবসা সংকট" নামে অভিহিত করা হয়, যা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার একটি ভয়ানক কুপ্রভাব। ১৯৩০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এরকম ভয়াবহ ব্যবসা সংকট দেখা দিয়েছিলো। চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস সিনেমায় আমরা সেসময়ের করুণ মানবেতর সমাজ জীবনের প্রতিফলন দেখতে পাই। 

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিলাস দ্রব্যের আশঙ্কাজনক উথ্থান চোখে পড়ে। পুঁজির মালিকরা এত বেশী লাভ করতে থাকে যে তাদের সম্পদের পরিমাণ রীতিমত ফুলে ফেঁপে ওঠে। তাই ব্যবসা সংকটের সময় যখন তারা নতুন করে পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে পারেন না, তখন তারা ভোগ বিলাসে মেতে ওঠেন। ১৯৩০ এর দশকের যে সময়টার কথা বলছিলাম, তখন সিংহভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে থাকলেও বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অস্টিন তাদের গাড়ি বিক্রির রেকর্ড করে ওই সময়ে, কারণ ধণিক শ্রেণী তখন তাদের পুঁজি নতুন করে বিনিয়োগ না করে বা মানবতার সাহায্যে এগিয়ে না এসে বিলাসে মেতে ওঠে, যে কারণে অস্টিনের বিক্রি বেড়ে যায় বহুগুণ। 

চতুর্থত, পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ কুটির শিল্প ও সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায়। এককালে আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে নিজস্ব লোকগীতি, নৃত্য প্রচলিত ছিলো। বিয়ে, গায়ে হলুদ, উৎসব পার্বণে গ্রামের মেয়ে ছেলে সকলেই এসব গান, নাচে মেতে উঠত। এগুলো বাঙালি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য ও অতিস্বকীয় অংশ। কিন্তু আজকাল গ্রামীণ সমাজেও স্থান নিয়েছে ডিজিটাল সব যন্ত্রপাতি, আজ সেসব উৎসবের আসন দখল করে নিয়েছে ডিজে গান, পশ্চিমা নৃত্য। পুঁজিবাদের প্রসারের ফলে এগুলো যত সহজলভ্য হচ্ছে, গ্রামীণ সংস্কৃতি তত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একই কথা গ্রামীণ কুটির শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, বাঁশ, বেতের তৈরি ঝুড়ি, ঝাপি, টুকরি, ঢাকনার জায়গা দখল করছে তুলনামূলক সস্তা প্লাস্টিকের পণ্য। কুমার বাড়ীগুলো তো এখন প্রায় উঠেই গেছে গ্রামাঞ্চল থেকে। এসব আমাদের লোক ঐতিহ্যের জন্য হুমকি বয়ে নিয়ে আসছে। 

পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে তামাম দুনিয়ার ধন সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে গুটিকয়েক মানুষের হাতে, সমাজের একটা বড় অংশ হচ্ছে দারিদ্র্য ও নিপীড়নের শিকার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে যদি তাকাই, অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করার পরেও সে দেশে মুকেশ আম্বানি, লক্ষ্মী মিত্তাল, রতন টাটার মতো বিলিয়নিয়ার রয়েছে, যারা পুরো পৃথিবীর অন্যতম সেরা ধনীর খেতাব নিয়ে বসে আছেন। তাদের সম্পদ বেড়েই চলেছে, পক্ষান্তরে বহু মানুষ ধুঁকছে মৃত্যুক্ষুধায়। এই কি পুঁজিবাদের শেষ পরিণতি? এ থেকে উত্তরণ পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? সময়ই তা বলে দেবে।

আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
এই বিভাগের আরো খবর