ব্রেকিং:
করদাতাদের সুবিধার্থে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ স্যানিটেশন মাস ও বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত জেলে পরিবারের মাঝে ছাগল বিতরণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও ইঁদুর নিধনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা কার্টুনে ভরা নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার পণ্যের মূল্য তালিকা ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ না থাকায় জরিমানা নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আহত ১৫ নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার স্বাস্থ্য সচেতনতায় মা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হাসপাতালে নবজাতক রেখে মা উধাও সাড়ে ৮ লাখ টাকা দিয়েও হলো না চাকরি, কাঁদলেন প্রার্থী ২০২৩ বিশ্বকাপের আয়োজক হতে পারে বাংলাদেশ! কোটি টাকার কারেন্ট জালে আগুন দেশের ‘অপরিচিত’ কিছু সমুদ্র সৈকত আপনার দেহে কি ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে? বুঝে নিন ১০টি লক্ষণে র‌্যাগিং বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আহ্বান ডিজিটাল মেলায় দেশি রোবট নিয়ে কৌতুহল জুতার বাজে গন্ধ দূর করুন সহজ একটি কৌশলে!

বৃহস্পতিবার   ১৭ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ১ ১৪২৬   ১৭ সফর ১৪৪১

১৪

একজন মিথের গল্প

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০১৯  

ডান হাতে বল নিয়ে দৌড়ে আসছেন একজন ফাস্ট বোলার। ম্যাচের আগেরদিনই প্রতিপক্ষকে ‘ধরে দিবানি’ বলে হুমকি দিয়ে রেখেছেন। নিজের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলটি অফ স্ট্যাম্পের একটু বাইরে ফেললেন। গুড লেন্থের বলটি ঠিকমতো ব্যাটে-বলে করতে পারলেন না বীরেন্দর শেবাগ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখতে পেলেন স্ট্যাম্প ছত্রখান। তিনি নিচু হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যেনো মনোবল হারিয়ে ফেলে শক্তিশালী ভারত দলও। এরপর চতুর্মুখী আক্রমণে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে দিয়ে বিশ্বকাপে স্মরণীয় এক জয় পায় বাংলাদেশ। ম্যাচের নায়ক ছিলেন সেই ফাস্ট বোলারটিই, বাবা-মা যাকে আদর করে ডাকেন কৌশিক বলে। বাংলাদেশি সমর্থকদের কাছে ভালোবাসার একজন মানুষ তিনি। ক্রিকেট বিশ্বে পরিচিত মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নামে, যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, একজন মিথ। 

১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর নড়াইলে নানু বাড়িতে মাশরাফীর জন্ম। ছোট থেকেই ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। নদীতে সাঁতার কাটা আর সারাদিন খেলে বেড়ানো, এটাই ছিল তার দৈনিক কাজ। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও খেলতেন ভালোই। 

বয়সভিত্তিক পর্যায়েই কোচদের চোখে পড়ে যান। হীরে চিনতে ভুল করেননি সে সময়ের খন্ডকালীন কোচ অ্যান্ডি রবার্টসও। তাই দ্রুত পাঠিয়ে দেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে কোন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট না খেলেই সরাসরি সুযোগ পান জাতীয় দলে। দারুণ গতির ফলে নাম দেয়া হয় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। 

 

 

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেন মাশরাফী। তার প্রথম শিকার জিম্বাবুয়ের গ্রান্ট ফ্লাওয়ার। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে মাত্র এক ইনিংস বল করার সুযোগ পেলেও চার উইকেট শিকার করে জানান দেন নিজের আগমনী বার্তা। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অভিষেক হয় দিন কয়েক পরেই। সে ম্যাচে ২ উইকেট নিয়েছিলেন ম্যাশ। সেই শুরুর পর এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ ভালোভাবেই রাজত্ব করে যাচ্ছেন চিত্রা পাড়ের ছেলেটি। 

তবে দেড় যুগের দীর্ঘ পথটা কখনোই সহজ ছিলোনা মাশরাফীর জন্য। অভিষেক সিরিজের পরে মাত্র এক সিরিজ খেলেই চলে যান ইনজুরিতে। ফিরে এসে আবার খেলেছেন, পুনরায় ইনজুরি তাকে ছিটকে দিয়েছে মাঠের বাইরে। এখনো পর্যন্ত ছোট-বড় সব মিলিয়ে ১৫ বার ইনজুরিতে পড়েছেন মাশরাফী। বার দশেক অস্ত্রোপচারের জন্য ছুরিকাঁচির নিচে যেতে হয়েছে। হার না মানা মাশরাফী বারবারই ফিরে এসেছেন দাপটের সঙ্গে, পরাজিত করেছেন ইনজুরিকে। 

২০০৬ সালকে মাশরাফীর ক্যারিয়ারের সেরা সময় বলা যায়। সে বছর তিনি ৪৯টি উইকেট শিকার করেন। যা এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশিদের মাঝে এক ‘ক্যালেন্ডার ইয়ার’-এ সর্বোচ্চ। একইবছর মাশরাফী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কৈশরের ভালোবাসা সুমির সঙ্গে। এখনো বেশ ভালোভাবে ও সুখেই আছেন তিনি। তাদের ঘর আলো করে এসেছে হুমায়রা ও সাহেল নামে দুই সন্তান। সুযোগ পেলেই পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন মাশরাফী। যা পরিবারের প্রতি তার কর্তব্যবোধের পরিচয় দেয়। 

 

 

আন্তর্জাতিক ব্যস্ততায় ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সুযোগ অনেক কম পেয়েছেন ম্যাশ। খুলনা বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করা মাশরাফীর সর্বোচ্চ ইনিংসটি ১৩২ রানের। আন্তর্জাতিক টেস্টে ৩টি অর্ধশতক রয়েছে তার। তবে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ তিনি। 

২০০৭ বিশ্বকাপে ছিলেন সহ-অধিনায়ক। সেবার ভারত বধে তার ভূমিকার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। ভালো খেলার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে পান অধিনায়কত্বের ব্যাটন। তবে ইনজুরি নামের কালো থাবা অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টেই ছিটকে দেয় তাকে। বলা যায় সেটিই ছিল তার শেষ টেস্ট ম্যাচ। ২০১১ বিশ্বকাপেও একই কারণে স্কোয়াডে জায়গা পাননি। স্কোয়াডে সুযোগ না পাওয়ায় মিডিয়ার সামনে তার কান্না ছুঁয়েছিল সবার হৃদয়। 

তবে মাশরাফী যে হার মানবার নন, এটি প্রমাণ করতেই ফিরে এসেছেন বারবার। ২০১৪ সালে একেরপর এক হারতে থাকা বাংলাদেশের দায়িত্ব আবার দেয়া হয় ম্যাশের হাতে। তার ছোঁয়াতে যেনো বদলে যায় সবকিছু। ২০১৫ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে জাতীয় দলকে এনে দেন সর্বোচ্চ সাফল্য। তার অধীনে সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। 

 

 

বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের কান্ডারি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। তার নেতৃত্বে পাকিস্তানকে ১৬ বছর পর হারানোসহ হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারানোর পেছনেও নেতৃত্বে ছিলেন ম্যাশ। প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা, কয়েকবার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা এবং বহুজাতিক টুর্নামেন্টের প্রথম শিরোপাও আসে মাশরাফীর হাত ধরে। এ কারণে তাকে ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ বলেও অভিহিত করা হয়। এখনো পর্যন্ত একটি টেস্টে অধিনায়কত্ব করা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সাফল্যের হার শতভাগ। ৮৫ টি ওয়ানডে ম্যাচে ৪৭ জয় ও ২৮ টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০ জয় তার অসাধারণ অধিনায়ক সত্তারই আরেক প্রমাণ। 

ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ মাশরাফীর। ৩৬ টেস্টে ৭৮ উইকেট শিকার করেছেন, যেখানে ৬০ রানে ৪ উইকেট সেরা সাফল্য। ব্যাট হাতেও করেছেন ৭৯৭ রান, যেখানে ৭৯ রানের সর্বোচ্চ ইনিংস তার ব্যাটিং সত্তার প্রমাণ দেয়। ২১৭ টি আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচে ২৬৬ ব্যাটসম্যানকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠিয়েছেন। সেরা বোলিং ফিগার ২৬ রানে ৬ উইকেট। এই ফরম্যাটে ব্যাট হাতে করেছেন ১৭৮৬ রান, যেখানে সর্বোচ্চ ইনিংসটি অপরাজিত ৫১ রানের। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বরাবরই দূর্বল বাংলাদেশ। তবে এখানেও মাশরাফীর পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভালো। ৫৪ ম্যাচে ৪২ উইকেট নিয়েছেন যেখানে ম্যাচসেরা বোলিং ১৯ রানে ৪ উইকেট। ব্যাট হাতে করেছেন ৩৭৭ রান। 

 

 

২০০৯ সালে ইনজুরির পর আর টেস্ট খেলেননি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায় নিয়েছেন ২০১৭ সালে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে শুধুমাত্র ওয়ানডে ম্যাচ খেলে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবন্ত এই কিংবদন্তি। 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টেও অন্যতম আকর্ষণ নড়াইল এক্সপ্রেস। ২০০৯ সালে আইপিএল-এর দল কোলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে ৬ লাখ ডলার দিয়ে কেনে। বিপিএল এ ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন করেছেন তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকেই। 

 

 

জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক মাশরাফী। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যাচ নেয়ার রেকর্ডও তারই। এছাড়া ভারতের বিপক্ষে টানা চার বলে চার ছক্কা মারেন তিনি, যা এখনো কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। 

লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে পরপর চার বলে চার উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব তার। অধিনায়ক হিসেবে দলে তার অবদান ও প্রভাব অনস্বীকার্য। তার সম্পর্কে সাকিব আল হাসান এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘মাশরাফী ভাই যদি না খেলে শুধু ড্রেসিংরুমে থাকেন তাও অন্যরকম উদ্দীপনা কাজ করে’। এ থেকেই জাতীয় দলে মাশরাফীর গুরুত্ব ও অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়। 

 

 

ব্যক্তিগত জীবনেও সফল একজন মানুষ মাশরাফী। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ জেলা নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ‘নড়াইল ফাউন্ডেশন’ সংগঠনের মাধ্যমে নিজ এলাকায় সেবা করে যাচ্ছেন তিনি। বিপিএলে রংপুর রাইডার্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পর ফ্র্যাঞ্চাইজি তাকে দামী গাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিল। অথচ এর পরিবর্তে তিনি জেলা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স দেয়ার অনুরোধ করেন। এ থেকেই বোঝা যায় ব্যক্তি মাশরাফীর মহত্ত্ব। 

যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন সফলতার দেখা। সিক্ত হয়েছেন মানুষের ভালোবাসায়। তার নামে মানুষ খোঁজে আশা, পায় ভরসা। তাই সব বাঁধা জয় করে এগিয়ে চলা মাশরাফীকে একজন মিথ বললে তা অত্যুক্তি হবেনা মোটেও। 

আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আলোকিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া
এই বিভাগের আরো খবর